পবিত্র ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও মুসলমানদের করণীয়

প্রকাশিত: 11:07 PM, May 11, 2021

পবিত্র ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও মুসলমানদের করণীয়

মুফতি আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান আল কাদেরী

অধ্যক্ষ- জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা,চট্টগ্রাম

 

পবিত্র মাহে রমযান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস, বান্দা এ মাসে ইবাদত বন্দেগী, তাসবীহ-তারাবীহ ও রোযা পালনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিরাজমান রিপু তথা আমিত্ব, গর্ব, অহংকার, বড়াই, ক্রোধ, কামভাব ও লোভ-লালসা ইত্যাদিকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

দীর্ঘ একমাস সিয়াম সধানার পর পবিত্র মাহে শাওয়ালের চাঁদ উদিত হয়, যাকে ঈদুল ফিতরের চাঁদও বলা হয়।
মাহে রমযানের ইবাদতের সমুদয় সওয়াব ও নেকী অর্জনের পর শুকরিয়া ও খুশি উদযাপনের জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা রোজাদার বান্দাকে বিশেষ দিন দান করছেন। যার নাম ঈদুল ফিতর।

এটা মূলত: মহান রাব্বুল আলামীনের আরেক অনুগ্রহ ও বদান্যতা। মাহে রমযানের সমাপ্তির পর মহান রাবুল আলামীনের আরো এক মহান নিয়ামত পবিত্র ঈদুল ফিতর’।

এ ঈদের রাত অতি মহত্বপূর্ণ ও অশেষ ফযীলত পূর্ণ এবং অত্যান্ত সাওয়াবপূর্ণ, ঈদ অর্থ খুশি, আনন্দ।
যা বার বার ফিরে আসে এবং আর একজন মুমিন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে বিলীন হতে সদা প্রস্তুত। ঈদুল ফিতর এতোই তাৎপর্যবহ যে, তা একজন মুমিনের জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়।

এ প্রসঙ্গে হাদীসে পাকে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
হযরত সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ্ ইবনে আবাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন- “যখন ঈদুল ফিতরের পবিত্র রাত আগমন করে সেটাকে ‘লায়লাতুল জায়েযা তথা পুরুষ্কারের রাত’ বলে আহবান করা হয়।
যখন ঈদের দিন ভোর হয়, তখন আল্লাহ্ তা‘আলা নূরানী ফিরিশতাদেরকে সব শহরে প্রেরণ করেন। তারা পথিবীর সব অলি-গলি-রাস্তাগুলোতে দাঁড়িয়ে আহবান করে, ‘‘হে উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম দয়াময় প্রতিপালক মহান প্রভুর দিকে চলো, যিনি দাতা এবং বড়-ছোট গুনাহ ক্ষমাকারী। তারপর মহান আল্লাহ্ তা‘আলা সম্বোধন করে বলেন, ‘‘হে আমার বান্দারা যা ইচ্ছা চাও!
আজ এই জমায়েত (তথা ঈদের নামায) আখিরাত সম্পর্কে যা কিছু চাইবে তা পূর্ণ করবো এবং দুনিয়া সম্পর্কে যা কিছু চাইবে যা মঙ্গলময় তোমাদের জন্য তা আমি দান করব।
[আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব: ২য় খন্ড, প. ৬০, হাদীস নং ২৩]

উপরোল্লেখিত হাদীসে পাক পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ রাত অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের রাতকে লাইলাতুল জায়েযা বা পুরুষ্কারের রাত সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এ রাত নেক্কার ও রোযাদার ব্যক্তিদের জন্য ঈদের বখশিশ পাওয়ার রাত এবং অসীম ও অশেষ সাওয়াব এবং ফযীলত হাসিলের রাত।

হাদীস পাকে উল্লেখ রয়েছে ঈদের রাত ইবাদতের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি দু’ঈদের রাতে (ফিতর ও আযহা) সওয়াব কল্যাণ লাভের আশায় জাগ্রত থেকে ইবাদত করবে, তাঁর অন্তর সে দিনও মরবে না, যেদিন অন্যদের (যারা ঈদের রাতে ইবাদত থেকে দূরে ছিল) অন্তরসমূহ মরে যাবে। সুবহানআল্লাহ
[সুনানে ইবনে মাজাহ্ শরীফ: ২য় খন্ড, পৃ. ৩৬৫, হাদীস নং ১৭৮]

অপর এক হাদীসে পাকে বর্ণিত রয়েছে- প্রখ্যাত সাহাবী হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
যে ব্যক্তি পাঁচটি রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। (সে রাত গুলো হচ্ছে) জিলহজ্জের ৮, ৯ ও ১০ তারিখের রাত (তিন রাত), ঈদুল ফিতরের রাত এবং ১৫ই শাবানুল মুআজ্জমের রজনী অর্থাৎ- শবে বরাত/ বরাতের রাত।
[আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব: ২য় খন্ড, ৯৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ২]

উপরাক্ত হাদীসে পাক হতে প্রতীয়মান যে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের রাত ও দিনের গুরুত্ব অত্যধিক। এ দিন আল্লাহ্ তা‘আলার অঢেল রহমতর ঢেউ খেলে। তাই এ সব রজনী ও বরকতমন্ডিত দিবসসমূহে ইবাদত ও নেক কাজগুলো বিশেষত: সদকা-খায়রাত, দান-দক্ষিণা অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণ করা মুসলমানদের নেহায়ত উচিত।
এবং আল্লাহ্ তা’আলার শুকরিয়া আদায় বেশি বেশি করতে হবে।

ঈদুল ফিতরের সুন্নাত সমূহঃ
ক) ঈদের নামাজের পূর্বেই সাদকাতুল ফিতর আদায় করা।
খ)সামর্থ ও সাধ্যানুযায়ী উত্তম পোষাক পরিধান করা।
গ) আতর বা সুগন্ধি লাগিয়ে ঈদের নামাযে যাওয়া।
ঘ) ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে মিষ্টিজাতীয় কিছু খাওয়া।
ঙ) তাকবীর পাঠ করা । আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লি-ল্লাহিল হামদ্।
চ) ঈদগাহে এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অপর/ভিন্ন রাস্তা (সম্ভব হলে) ফিরে আসা।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আজকাল আমরা মুসলমানেরা পবিত্র এ বুজর্গ রাতের গুরুত্ব-ই ভুলে গিয়েছি। আফসোস।
এ রাত ও দিনের মাহাত্ম্য ভুলে গিয়ে আমরা উম্মাদ হয়ে অশ্লীল নাচ, গান, চিত্ত বিনোদন, রং-ঢং, অশ্লীল-বেহায়য়াপনা, বিভিন্ন বেহুদা খেলাধুলায়, ঘরে ঘরে টিভিশোর মাধ্যমে নাটক-ফিল্ম, উলঙ্গ-পনা ও বেহাইয়াপনা ইত্যাদির প্রতি ঝুকে গিয়ে সময় ও সম্পদ দুটোই সুন্নাত ও শরীয়ত বিরোধী কাজে বরবাদ করে দিচ্ছি।

অনেক মুসলমান নর-নারী ঈদুল ফিতরের আনন্দ ও খুশির নামে নামায-কালাম ছেড়ে দিয়ে গুনাহ নাফরমানীতে লিপ্ত হয়ে যায়। আফসোাস হাজার আফসোস। তাছাড়া আধুনিকতার নামে অবাধ বিচরণ, নারী পুরুষের বেপর্দা মেলামেশা ইত্যাদি আজ মুসলিম সমাজে মহামারী আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে আল্লাহ রহমত উঠে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন বালা-মুসিবত,গজব নাজিল হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বেহায়য়াপনা ও নাফরমানী থেকে হেফাযত করুক।

আর তাই পবিত্র ঈদুল ফিতরের রজনী ও ঈদুল ফিতরের বরকতমন্ডিত দিবসে ফরয ওয়াজিব ও সুন্নাত ইবাদতের সাথে সামর্থনুযায়ী নফল ইবাদত দান-সদকা ইত্যাদি বেশি আদায় করা উচিত ও কর্তব্য।
উল্লেখ্য যে, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা এবং জিলহজ্জের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ দিবস রোযা রাখবেন না।
কারণ এসব দিবস আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য জিয়াফত বা মেজবান।
তবে রোযা ছাড়া অন্যান্য ইবাদত বেশি আদায় করতে পারবেন। এটাই ঈদুল ফিতর উদযাপনের সঠিক তরিকা।

আল্লাহ তায়ালা মাহে রমজানের পরবর্তী মাহে শাওয়াল ও ঈদুল ফিতরের উসিলায় রহমত নাজিল করুক। মহামারী করোনা ভাইরাস সহ যাবতীয় বিপদাপদ, বালা-মুসিবত হতে আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন। বেহুরমতে সায়্যিদিল মুরসালিন।