করোনার শিক্ষা ও হোম কোয়ারেন্টিনের পরিকল্পনা

প্রকাশিত: 1:29 PM, March 28, 2020

”মুহাম্মদ আফজাল হুসাইন“

৩৯ বছরের জীবনে এমন বিশ্বপরিস্থিতি দেখার সুযোগ আসে নি। বিশ্বব্যাপী এমন এক অদৃশ্য রোগ ছড়িয়ে গেছে, যার ভয়ে-আতঙ্কে বন্ধ হয়ে গেছে পৃথিবীর সকল ব্যস্ততা। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মদমত্ততায় উন্মাতাল বড় বড় শহরগুলো। এখন তা নিঝুম দ্বীপের মত নিরব, অন্ধকার রাতের মত নিস্তব্ধ, মধ্যদুপুরের শ্মশানের মতই ভুতুড়ে। কাছে আসার সকল গল্প এখন দূরে সরো দূরে সরোর চিৎকারে বেশামাল। অশ্লীল নৃত্য, মদ-গাঞ্জার সকল উল্লাস পিপীলিকার গর্তে নির্বাসিত। নির্বিচারে যুদ্ধবিধি লংঘন করে অস্ত্রের ঝনঝনানির রিনিঝিনি এখন আর বাজে না। চুপসে গেছে দাম্ভিকতার তাবৎ আয়োজন-উৎসব। লাখো লাখো আক্রান্ত। হাজার হাজার নিহত। গোটা বিশ্ব এখন ভয়াল অরণ্য।

সকল পরাশক্তি ও তাদের শক্তিদেবতারা নিঃস্ব-অসহায়, তাদের গর্বের মুকুট চূর্ণ। আরাধ্য বিজ্ঞান পুরো নির্বাক। রিসার্চ-গবেষণা নিস্ফল। পুরো পৃথিবীটাই স্তব্ধ ও অচল হয়ে পড়ে আছে।

এমন বিভীষিকাময় পৃথিবী সম্ভবত ইতিহাসে কখনও আসে নি। এই বিশাল ঘটনা থেকে আমরা কী শিখতে পাই?
অনেক কিছুই শিখতে পারি। সবচে বড়, এক আল্লাহর ক্ষমতার কিঞ্চিত আভাস দেখতে পাই। তাবৎ অন্যায় থেকে ফিরে আসার দীক্ষা পাই।

এখন আমাদের করণীয় কী কী হতে পারে, আসুন তাই বিশ্লেষণ করা যাক।

১. আমরা কতটা অনুতপ্ত, আমাদের কৃতকর্মের কারণে? আমরা কি খাঁটি মনে তাওবাহ্ করতে পেরেছি? ভবিষ্যতের জন্য সব রকম অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে পেরেছি?
২. গুনাহের উপকরণ সব ঘর-অফিস-মন থেকে সরাতে পেরেছি?
৩. জীবনটাকে নতুন করে সুন্দর পরিচ্ছন্ন আদর্শ স্বপ্ন দিয়ে সাজাতে পেরেছি?
৪. হোম কোয়ারেন্টাইনের অবসরকে সার্থক করে তুলতে পারছি?
৫. নিজের ও পরিবারের জন্য কী কী করতে পারছি? তাদের জীবন ও মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে কি ভাবার সুযোগ হয়েছে?
৬. আশে পাশে যারা অভুক্ত কিংবা সমস্যাগ্রস্ত, তাদের খবর নিতে পেরেছি?
৭. নিজের, নিজের ঘর ও আশপাশের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে কতটা সচেতন হয়েছি? দৈনিক/সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতার কাজটি কি সুন্দরভাবে সম্পন্ন হচ্ছে?
৮. ইসলামের নির্দেশিত সুন্দর জীবনযাপন পদ্ধতি তথা দৈনন্দিন সুন্নাতগুলো কি ঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারছি?
৯. পবিত্র কুরআন ও হাদীসের সাথে কতটা সম্পর্ক ও গভীরতা তৈরি হয়েছে?
১০. সন্তানের দুনিয়া ও আখেরাতের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং করেছি?

উপরুল্লিখিত প্রশ্নমালার আলোকে নিজেকে যাচাই করতে পারি। আমরা কোথায় আছি। কোথায় থাকা দরকার।

 

আর করোনা ভাইরাসের এই মহাবিপদকালীন দেশের সবচে ক্ষতিগ্রস্ত দিনমজুর, অসহায় মানুষগুলোর জন্য আমরা কী কী করছি? অনেককে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগিয়ে এসেছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছু পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা তুলে ধরছি-

১. দেশের সকল মসজিদ-মাদরাসা ও স্কুল-কলেজের কমিটির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে এলাকার দরিদ্র, দিনমজুর-নিঃস্বদের একটা তালিকা তৈরি করে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা।
২. সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিশেষ করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তথা হাজার হাজার এনজিওর পক্ষ থেকে এলাকাভিত্তিক তালিকা করে কর্মহীনদের খাবারের ব্যবস্থা করা।
৩. দেশের দূর্যোগ ও ত্রাণ বিভাগকে ন্যায় ও সততার সাথে এলাকাভিত্তিক সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে নিরুপায়-অসহায়দের খাবারের ব্যবস্থা করা।
৪. এমপি, মন্ত্রী, সচিবসহ রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীলদেরকে স্ব স্ব এলাকার দুঃস্থদের তালিকা করে খাবারের ব্যবস্থা করা।
৫. রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খরচমূল্যে অভাবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
৬. সিটি করপোরেশনকে কঠোরভাবে দায়িত্বপালনে সচেষ্ট থাকা। বিশেষত রাস্তা-ঘাটের খোড়াখুড়ির কাজ দ্রুত সমাপ্ত করা।
৭. প্রতিদিন প্রত্যেকটা গলি ঝাড়–র ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে বেকার ও কর্মহীনদের কাজে লাগানো।
৮. প্রত্যেক বাড়িঅলাকে নিজ নিজ ভবন ও বাড়ির চতুর্দিক পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া।
৯. প্রত্যেক নাগরিক যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলার ব্যাপারে সচেতন থাকা।
১০. দেশ থেকে সব ধরণের অশ্লীল সিনেমা ও পোস্টার সরিয়ে ফেলা।

সরকার ও জনগণ যার যার অবস্থান থেকে সচেতন ও সতর্ক হলে আশা করা যায় দেশের একটা সুন্দর ইতিবাচক পরিবর্তন অপেক্ষা করছে।

 

সবশেষে পরিতাপের সঙ্গে কিছু কথা বলতে হচ্ছে-

১. দেশের নাগরিক হিসাবে এক হওয়ার এইতো সুযোগ। আর কত দ্বন্দ্ব-কলহ, ঝগড়া-বিবাদ করতে থাকবো?
২. ছোটরা কেনো বড়দের বিষয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে? বিষয়টি বড়ই দুঃখজনক।
৩. অন্যের বদনাম ও সমালোচনার একটা নোংরা কালচার যেনো প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। আর কত?
৪. এই মানবিক বিপর্যয়ের বেদনার্ত পরিস্থিতিও কেনো প্রশাসন মারমুখী আচরণ করছে?
৫. আমাদের পাবলিকদেরও দোষ কম না, ঘরে না থেকে শুধু রাস্তা-ঘাটে অযথা কেনো ঘোরাঘুরি এখনও চলছে?
৬. এখনও গান-বাদ্যের আওয়াজ শোনা যায়। এখনও অন্যায়-অসৎ কর্মকাণ্ড কীভাবে সংগঠিত হয়?
৭. এখনও কি পূর্ণাঙ্গরূপে আল্লাহর কথামত চলার সময় হয় নি?
৮. করোনার ভয়ে কিছু নিয়ম মেনে চলতে শুরু করেছি। ভালো। তবে জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য কি নিয়ম মানার দরকার নেই?
৯. কবরের জীবনে একা থাকতে হবে। হোম কোয়ারেন্টাইন কি তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে না?
১০. এখনই নিজেকে শোধরানো না গেলে আর কখনো কি শোধরানো যাবে?০.

তাই আসুন! আমরা আজ থেকে পুরোপুরি খাঁটি মনে তাওবা করে এক আল্লাহর গোলাম হয়ে যাই। জীবনকে সুন্দরভাবে ইসলামের পথে চালিত করি। তবেই করোনা থেকে আমাদের শিক্ষা অর্জিত হবে। ছুটির এই অবসর সার্থকভাবে যাপিত হবে। আল্লাহ আমাদের সকল প্রকার পাপাচার থেকে মুক্ত হয়ে কল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

 

লেখক: চেয়ারম্যান, ক্যারিয়ার বাংলাদেশ
সহ-সভাপতি, জাতীয় লেখক পরিষদ
ফাউন্ডার এন্ড প্রিন্সিপাল, জামিয়া মুনাওয়ারাহ ঢাকা
পরিকল্পক: ইয়াং ইন্টেলেকচুয়াল সোসাইটিি ও ইত্তিফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা