বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: আলেমসমাজ ও কওমী মাদরাসা!

প্রকাশিত: 3:31 PM, March 27, 2020

আমরা মুসলিম বাঙালি। আমাদের দেশ লাল সবুজের এই বাংলাদেশ। ২৬শে মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। দীর্ঘ সংগ্রাম আর বিপুল রক্তের বিনিময় ১৯৭১ সালে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে হিজল-তমাল, তরুলতা আর সবুজ-শ্যামলতায় ঘেরা রূপসী বাংলাদেশ। বিশ্বের দরবারে আমাদের আত্মপরিচয় ঘটেছে স্বাধীন বাঙালী জাতি হিসেবে। অনেক প্রগতিশীলদের ধারণা, স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেমসমাজ ও কওমী মাদরাসাগুলো তেমন অবদান রাখেনি। তাদের এ ধারণা ভুল। এ ব্যাপারে কিঞ্চিৎ আলোচনা প্রয়োজন।

 

বাংলাদেশের শীর্ষ কওমী মাদরাসাগুলোর মধ্যে অন্যতম মাদরাসা হলো চট্টগ্রামের জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়া মাদরাসা। এই মাদরাসাটি মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের স্বাক্ষী। ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসে মরহুম জেনারেল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানকে আশ্রয় দেয়ার অপরাধে পটিয়া মাদরাসার একাধিক শিক্ষককে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন নিশ্চিত হয়, পটিয়া মাদরাসার আলেমরা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছেন, তখনই (১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল) পটিয়া মাদরাসার উপর জঙ্গি বিমান দিয়ে বোমা বর্ষণ শুরু করে।

 

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এই বোমা বর্ষনে পটিয়া মাদরাসার শিক্ষক আল্লামা দানেশ ও ক্বারী মাওলানা জেবুল হাসানসহ অনেকেই শহীদ হন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলবদর রাজাকার বাহিনীর কাছে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করার অপরাধে দেশের একজন স্বনামধন্য আলেমও শহীদ হয়েছিলেন। তার নাম মাওলানা অলিউর রহমান। ১৪ ডিসেম্বর উনার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় রায়ের বাজার বদ্ধভূমিতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা বেয়নেট দ্বারা খুচিয়ে খুচিয়ে উনাকে হত্যা করে। ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা থানার জয়দা গ্রামের মাওলানা বাড়ির সবাই মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন। মাওলানা বাড়ির ছেলে মাওলানা হাবীবুর রহমান, যিনি সরাসরী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট এর সনদ ক্রমিক নং ১০০৯। মাওলানা বাড়ির জামাই হাফেয মোহাম্মদ মহিউদ্দীন আহমদ ভারতীয় ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধা। উনার ক্রমিক নং ৯৫২। এইরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। “মুক্তিবাহিনীকে সমর্থন করার জন্য রাজবাড়ী জেল খানায় মাওলানা কাজী ইয়াকুব আলীকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী।

 

মাওলানা কাজী ইয়াকুব আলীকে গলা কেটে হত্যা করে, তারপর তার পেটের মাঝখানে পাকিস্তানি পতাকা পুঁতে দিয়ে বলে, ‘আভি শালা জয় বাংলা বোলো”। শুধু তাই নয় ১৯৭১ সালে এই দেশে ভারতের দেওবন্দ মাদরাসাকেন্দ্রিক প্রাচীন সংগঠন “জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম” এর নেতারাও কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে অনেক কাজ করছেেন, ফতোয়া, বিবৃতি দিয়েছিলেন। “১৯৭১ সালে দেওবন্দি আলেম শায়খুল ইসলাম মুফতী আমীমুল এহসান রাহ. পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ফতোয়া দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইয়াহিয়া সরকার তাঁকে জোর করে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীনের পর তিনি বাংলাদেশে ফিরলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রধান খতীব হিসেবে নিযুক্ত করেন।

 

১৯৭১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সবচেয়ে বড় কওমী মাদরাসার প্রধান মুহতামিম ফখরে বাঙাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রাহ. পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অনেক বড় বড় আলেম তার ফতোয়া শুনে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অনেক মুক্তিযুদ্ধাকে আল্লামা তাজুল ইসলাম নিজের বাসায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। সাংবাদিক শাকের হোসাইন শিবলি সহস্রাধিক পৃষ্ঠার একটি বই লিখেছেন। বহুল প্রশংসিত সেই বইটির নাম- ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে।’ এ বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইয়ের ইতিহাস।

 

এ চেতনায় শত শত আলেমের অস্ত্র তুলে নেবার রোমাঞ্চকর ইতিবৃত্ত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলার বিভিন্ন মত ও পেশার লোকেরা অংশগ্রহণ করেছিলেন যেমন, ঠিক তেমনই বাংলার আলেমসমাজও এর থেকে দূরে ছিলেন না। সুতরাং স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেমসমাজের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। প্রগতিবাদীগণ মনে রাখবেন, আলেমসমাজ এই উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়িত না করলে এবং ১৯২০সালে আলেমদের সংগঠন ‘জমিয়ত’র ব্যানারে সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী উত্তাপন না করলে আজও স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতে পারতেন কিনা নিতান্তই সন্দেহের বিষয়!!

শাহিদ হাতিমী লেখক- কলামিস্ট, সম্পাদক, পুষ্পকলি।